কানাডাতে প্রফেশনাল চাকরি – বাস্তবতা এবং কিছু সম্ভাব্য ইঙ্গিত

Ca-Passport

বাংলাদেশ থেকে শোনা তথাকথিত ল্যান্ড অফ অপারচুনিটির দেশগুলির মধ্যে ক্যানাডা একটি, যদিও এই ল্যান্ড অফ অপারচুনিটির সঠিক সংগা আমার জানা নেই। হয়তোবা সংগাটি আপেক্ষিক বা আত্ম-প্রযোজক। যা হোক  বাস্তবে কি সেটা দেখা যাক।

বলে রাখা ভাল আমি যে কথাগুলি বলবো তা আমার বিগত ১৪/১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে। হয়তো বা এর পূর্বের পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। অনেক কষ্ট এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আমরা এখানে আসি একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ এবং উন্নত জীবনের আশায়। আসার আগে আমরা এর বিপরীত কিছু শুনতে চাই না বা শোনার আশাও করিনা। রেডিও-টেলিভিশন, পত্র পত্রিকা এমনকি কানাডিয়ান সরকারী ওয়েবসাইটের রকমারি তথ্য ছাড়াও এই ধরনের স্বপ্নের বা আশার আরো একটি কারন আছে। সে কারনটি হলো আমরা যারা এখানে স্থায়ী ভাবে থাকি তাদের অধিকাংশই কোন একটি অজানা কারনে দেশের লোকের কাছে সব সময় সঠিক তথ্যটি তুলে ধরি না। বিশেষ ভাবে আমাদের চাকরি এবং বাস্তবতার কথা হয়তো বা আমরা সংকীর্ণতায় ভূগি অথবা আত্বীয় স্বজন বা বন্ধু বান্ধবদেরকে নিরাশ করতে চাই না। অনেকে আবার সত্য এবং বাস্তবকে বিশ্বাস ও করতে চাইবেনা।

আমরা কষ্ট করে অর্থ সঞ্চয় করে ২/৪ বছর পরে দেশে যাই, ২/৪ মাস থাকি, কনভার্টেট টাকায় শপিং করি, বাড়ি গাড়ির গল্প করি, সি এন টাওয়ার আর নায়াগ্রা ফলস এর ছবি দেখাই, আর এই গুলিই চোখ ধাঁধিয়ে দেয় অভিবাসন  ইচ্ছুক দেশবাসিকে। আর মাশাল্লাহ, এ যুগের ফেসবুকতো আছেই।

উপরোক্ত জিনিষগুলি দেশের লোকদের জানালে কোন অসুবিধা নেই যদি কি না ও গুলি অর্জনের পিছনের সঠিক চিত্রটা তুলে ধরা হয়। যেমন একটি ঘটনার কথা বলি। আমি যখন পড়াশুনা চলাকালিন এবং তৎ পরবর্তী প্রফেশনাল চাকরি খোঁজাকালিন সময়ে হোটেলে বয় বেয়ারার কাজ করতাম তখন  এ কথাটি এখানকার এক বাংলাদেশী বন্ধুর সামনে দেশের লোককে বলায় সে মনক্ষুন্ন হয়েছিলো কারন সে চায়নি  যে দেশের লোক ভাবুক আমরা এখানে এধরনের কাজ করি । যদিও আমি নিশ্চিত আমার ঐ বন্ধু এবং অনেকে শ্রমের মূল্য বা Dignity of Labor  রচনা লিখে  অনেক খ্যাতি অর্জন করেছেন। রুঢ়  বাস্তব হলো আপনি দেশ থেকে যত বড় ডিগ্রি এবং যত বড় কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে আসেন না কেন এখানে এসে দ্রুত একটি প্রফেশনাল চাকরি পাওয়া স্বপ্ন  বা লটারী পাওয়ার মত। তবে কেউ  যে পাচ্ছে না তা নয়। সেক্ষেত্রে শতকরা হারটি অত্যান্ত কম, ধরুন ২% বা ১%। এখন কথা হলো আপনি এই সীমিত হারের উপর ভিত্তি করে জীবনের একটা বড় ঝুকি নিবেন নাকি ৯৮% বা ৯৯% উপর বিচার বিবেচনা করে পা বাড়াবেন । আপনি ঐ ২% বা ১% এর উপর ঝুঁকি নিতে চাইলে হয়তো বা এ লেখাটি  আপনার জন্য নয়।আপনি যদি এখানে এসে  আপনার শিক্ষা, কাজের অভিজ্ঞতা, পেশাগত ইংরেজী ভাষার আপগ্রেড করা এবং সেজন্য কিছু কঠিন সময় ব্যয় করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে আসেন অথবা আপনার নিজের প্রফেশন ছাড়া অন্য চাকরি বা অড্ জব করে জীবন যাপন করতে চান তাহলে কোন অসুবিধা নেই এবং  দেশটি আপনার জন্য অনেকদিক থেকেই ল্যান্ড অফ অপারচুনিটি হতে পারে।

এখন আপনার পক্ষে যদি উপরোক্ত কোনটিই সম্ভব নয় তাহলে আপনি অবশ্যই এদেশে থাকতে পারবেন, অর্থ উপার্জন করতে পারবেন।কিন্তু আপনার জীবন হবে মানবেতর। না পারবেন এ জীবনকে মেনে নিতে, আবার না পারবেন দেশে ফিরে যেতে আর প্রতি নিয়ত মনে হবে “কেন এসেছিলাম” অথবা আগে যদি জানতাম। এখানে অনেক ডাক্তার, ইনজিনিয়ার , দেশের ভূত পূর্ব বড় সরকারী চাকরিজীবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক/শিক্ষিকা, বড় প্রতিষ্ঠানের  ভূতপূর্ব কর্মকর্তা আছেন যারা খাবার হোটেলে বয় বেয়ারার, চায়ের দোকানে ক্যাশিয়ার, ডিপার্টমেন্টাল ষ্টোরে বা ফ্যাক্টরীতে চাকরি করছেন। এদের কেউ কেউ এ কাজ করে বাড়ি গাড়ি করছেন এবং মানষিকভাবে ভালই আছেন। কিন্তু অনেকেই আছেন যারা এভাবে আছেন কিন্তু মন থেকে কখনোই এ জীবন মেনে নিতে পারেন না আবার দেশে গিয়ে পূর্ব অবস্থার ও ফিরে যেতে পারেন না এবং এদের জীবনটা হয় অত্যন্ত কঠিন। আমার এই লেখাটি এ ধরনের ব্যক্তিদের কিছু তথ্য দেওয়া যাতে করে তারা ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং এই পরিস্থিতিকে এড়াতে পারেন। দেশের শিক্ষা এবং কাজের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও কেন এখানে সুবিধা এবং পছন্দ মত প্রফেশনাল কাজ পেতে হিমসিম খেতে হচ্ছে। এমনকি অনেকে এখানে কিছুটা আপগ্রেড করার পর ও পছন্দ মত প্রফেশনে কাজ পাচ্ছেন না অনেকে।

এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিজিং প্রগ্রামের একটি ওয়ার্কিং গ্রুপে খন্ডকালিন কাজ এবং আমার বর্তমান পেশায় কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে আমাদের দেশের তথা দক্ষিণ এশিয়ার প্রফেশনালদের মধ্যে যে ছোট সমস্যাগুলি খুঁজে পেয়েছি সেগুলি নিয়েই সংক্ষেপে আলোচনা করতে চাই। এবং সেগুলি প্রতিকারের সম্ভ্যাব্য কিছু উপায় উল্লেখ করতে চাই। সমস্যাগুলির অন্যতম একটি হচ্ছে এখানকার ইংরেজী ভাষার উপর প্রফেশনাল  Communication Skill এর অভাব । আমরা এর উপর যে দক্ষতা নিয়ে আসি তা দিয়ে দৈনন্দিন জীবন যাপন বা অড্ জব করতে কোন অসুবিধা নেই, কিন্তু পেশাদার কোন কাজ করতে হলে সে অনুযায়ী দক্ষতার অব্যশই প্রয়োজন আছে। মনে রাখতে হবে IELTS বা  TOEFL এ উচ্চ মার্ক পাওয়া বা অন্য বিষয়ে ভাল ফলাফল মানেই যে প্রফেশনাল ইংরেজীতে দক্ষ হওয়া সেটা ঠিক নয় । আবার এখানে কোন একটি প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন পড়াশুনা করলেই এ সমস্যার কোন সমাধান নেই। ৯০% নির্ভর করবে আপনার নিজের উপর, প্রতিষ্ঠান আপনাকে শুধু দিক নির্দেশনা এবং সনদ পত্র দিবে। সংগে সংগে আপনাকে নিয়মিতভাবে অনুশীলন করতে হবে, এদেশের মূল ধারার খবরাখবর সম্মদ্ধে নজর রাখতে হবে, নিজের ত্রুটি গুলিকে খুঁজে বের করতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আপনার Discomfort জোন থেকে বের হয়ে আসতে হবে । নমনীয় হয়ে যদি কারো কাছ থেকে কিছু জানা যায় তাতে আত্মসম্মান এর কোনই ক্ষতি হয় না। যথাযোগ্য প্রফেশনাল ভাষার দক্ষতার অভাবে অনেক কেই দেখেছি তারা নিজেদের অতি মূল্যবান শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরতে সক্ষম হননি অথচ ঐ ব্যক্তিটিই কোন প্রতিষ্ঠানের অনেকের চেয়ে ভাল কাজ করতে পারতেন।

আর একটি বিষয় আছে সেটা হলো আমাদের অনেকের শিক্ষা সনদ পত্রের সমমান মূল্যায়ন করা নেই এবং করিও না ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বুঝতে পারেন না আমাদের সনদ পত্রের লেভেল। অবশ্য এ বছর থেকে যারা SKILLED ক্যাটাগোরিতে Apply করবেন তাদেরকে এখানে আসার আগে থেকেই তাদের সনদ পত্রের সমমান মূল্যায়ন করতে হবে। এখানে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা এগুলি করে থাকে। অনেক সময় আমরা আমাদের চাকরির দরখাস্তে (Resume and Cover Letter) আমাদের যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতার সঠিক চিত্র তুলে ধরতে পারি না। আমি যদি একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হই তাহলে দরখাস্তে আমার Job Description একজন কেরানির Job Description এর থেকে ভিন্ন হতে হবে অথচ এ রকম প্রায়ই দেখা যায়, ফলে আমাদের শিক্ষা এবং চাকরির অভিজ্ঞতা সত্য হওয়া সত্তে ও Employer রা ভূয়া বলে ধরে নেন।

আসলে উচিত প্রথমে বিষয় গুলি সুন্দর করে বাংলা ভাষায় গুছিয়ে নিয়ে তারপর ইংরেজী ভাষার প্রয়োগ করা উচিত। নিজের মাতৃভাষা ভাল না জানলে বিদেশী ভাষাকে ভাল করে জানা যায় না। এ ব্যাপারে প্রফেশনাল এবং নন প্রফেশনাল উভয় সাহায্যেরই প্রয়োজন আছে।আশ্চার্য হলেও সত্য যে Tell me about yourself প্রশ্নটির উত্তর দিতে অনেকেই হিমসিম খান। আমরা মনে করি এটা আবার কি সমস্যা। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে আপনি বারবার চেষ্টা না করে যদি কোন ইন্টারভিউতে যান আপনি যথাসময়ে এই প্রশ্নের সুন্দর একটি উত্তর দিতে পারবেন না। এবার ইন্টারভিউ এর ব্যাপারে আসি। আমাদের দক্ষিণ এশিয়দের একটি কমন সমস্যা আমি প্রায়ই দেখতে পাই যেটা আমারও এক সময়ে ছিল, তা হলো আমরা ইন্টারভিউ এ প্রয়োজন এর তুলনায় বেশি বলে ফেলি এবং তাতে করে আমাদের মুল পয়েন্ট অনেক সময় হারিয়ে যায় এবং যিনি ইন্টারভিউ নেন তিনি মনে মনে অতিষ্ঠ হয়ে যান। এখানেও একই কারন, পর্যাপ্ত অনুশীলনের অভাব। তবে এ ব্যাপারে দক্ষ হওয়া কোন রকেট সায়েন্স বা অসাধ্য কিছু নয়। Just Practice It. প্রয়োজনে নিজের উত্তর নিজেই রেকর্ড করুন এবং শুনে শুনে উত্তরটা সুন্দর করার চেষ্টা করুন।

এবার প্রফেশনাল চাকরি খোজার ক্ষেত্রেও কিছুই কৌশল অবলম্বন করতে হবে। যেমন সাধারনত আমরা পত্র পত্রিকা বা ইন্টারনেটে Job সাইটে চাকরির বিজ্ঞাপন থেকে দরখাস্ত করি। কিন্তু ঐ জায়গা গুলিতে শুধুমাত্র কিছু সংখ্যক বিজ্ঞাপন থাকে। আপনাকে আসলে Proactive হতে হবে। মনে রাখতে হবে চাকরি খোঁজা একটি ফুল টাইম চাকরি। ঐ সমস্ত জায়গার বিজ্ঞাপন ছাড়াও আপনাকে খোঁজ নিতে হবে পরিচিত দের কাছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্টে, ফেডারেল, প্রভিন্সিয়াল বা লোকাল গভর্নমেন্টের Employment Site-এ এবং খোঁজ খবর রাখতে হবে সমসাময়িক বিষয়ের উপর। সরকারের বিভিন্ন পলিসির পরিবর্তনে অনেক সময় যেমন অনেক চাকরি কাট হয় ঠিক তেমনি অনেক চাকরি তৈরিও হয়। যেমন আমি আমার প্রফেশন থেকে উদাহরণ দিতে পারি। বর্তমান সরকার হাসপাতাল গুলি থেকে Social Worker- দের Position কমাতে চাচ্ছেন তাদের খরচ বাচানোর জন্য কিন্তু সেক্ষেত্রে Community Level-এ অর্গানাইজেশন গুলিতে চাকরির সুযোগ হবে কারন প্রতিষ্ঠানিক সেবার চেয়ে Community লেভেল এর স্বাস্থ সেবায় খরচ কম।
আবার ধরুন আগামী ১০/১৫ বৎসরে অনেক Baby Boomer রা অবসরে যাবেন এবং এদের  অনেকেরই অনেক সমস্যা থাকবে আর তাই Senior Related  চাকরির সম্ভাবনা বেশি থাকবে আর তাই আপনি পত্র পত্রিকার বিজ্ঞাপনের অপেক্ষায় না থেকে আগে থেকেই এই বিষয়ের প্রতিষ্ঠান বা মন্ত্রনালয়ে খবর রাখুন এবং সময়মত দরখাস্ত করুন। আপনাকে প্রথমে ভাবতে হবে আপনি কি চান এবং আপনার বয়স, যোগ্যতা এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিপেক্ষিতে কোনটি প্রযোজ্য তার পর যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নেন তাহলে আপনাকে নিরাশ হতে হবে না বা বলতেও হবে না যে “আগে যদি জানতাম”।

লেখাটির কোন অংশ কার কাছে যদি আপত্তিকর মনে হয় সে জন্য আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। এটি নিছক কিছু তথ্য তুলে ধরার জন্য লেখা। এই ওয়েব সাইট নিয়মিত চোখ রাখুন। ভবিষ্যতে এখানকার ভৌগলিক আকর্ষনীয় স্থান, সহজ এবং সস্তায় ভ্রমন, অভিভাষন এর ইতিহাস এবং আরো অনেক বিষয় লেখার আশা নিয়ে এবং জনাব হাফিজুর রহমান: হুময়ুন কবিরের এই উদ্দেশ্যকে স্বাগত জানিয়ে শেষ করছি।

343,839 total views, 5 views today

প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। পোষ্ট লেখক অথবা মন্তব্যকারীর অনুমতি না নিয়ে পোস্টের অথবা মন্তব্যের আংশিক বা পুরোটা কোন মিডিয়ায় পুনঃপ্রকাশ করা যাবে না।

9 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *