আমরা অধিকাংশই এখনো দাস ! এই দাসত্বের কি মুক্তি আছে ? জি হাঁ, আছে।

বিখ্যাত নিউরো সাইন্টিস্ট D. Norman Doege তার ” The Brain that change itself” বইয়ের এক জায়গায় লিখেছেন যে আমরা কিছু কিছু জিনিস যদিও nurture এর মাধ্যমে অর্জন করে থাকি, কিন্তু দীর্ঘদিন সেটিতে অভ্যস্ত হওয়ার ফলে ধরে নেই ওটি বোধ হয় natural এবং জীবনেও পরিবর্তন সম্ভব নয়। আর এই nurture কে nature ধরে নেওয়ার বদ্ধ ধারণাই আমাদেরকে পিছিয়ে রাখে আমাদের harmful অভ্যাসগুলি পরিবর্তন থেকে। ডান হাত দিয়ে খাওয়া দাওয়া আমাদের natural নয়, আমরা নিজেরা তৈরী করেছি, অতএব ইচ্ছা করলে সেটি পরিবর্তন করা যায়। এটি কোনো harmful অভ্যাস নয় , জাস্ট উদাহরণ দিলাম।

এই একবিংশ শতাব্দীতে বসেও আমরা এখনো দাস। না, আমি অন্য কোনো দাসত্বের কথা বলছি না। আমরা কম বেশি সবাই আমাদের অভ্যাসের দাস। জানিনা কে বলেছিলেন, “মানুষ অভ্যাসের দাস”. কথাটি খুবই সত্যি। এবং এই দাসত্ব থেকে বের হওয়া খুবই কঠিন কাজ, তবে আপনার self-motivation থাকলে আপনি এই দাসত্ব থেকে সব না হলেও অনেকটা মুক্তি পেতে পারেন। হাঁ, ভালো ভালো যে অভ্যাসগুলি আছে আমি সেগুলির কথা বলছি না। শুধুমাত্র যে অভ্যাসগুলি বদলাতে পারলে আপনার দৈনন্দিন জীবন আরো একটু সুন্দর হতো সেগুলির কথা বলছি।

আমি আপনাদের কথা জানিনা, তবে আমার জীবনে অনেক অনেক ছোটোখাটো harmful অভ্যাস আছে, যেগুলিকে কখনই harmful অথবা ওগুলি পরিবর্তন দরকার সেটি ভাবি নি। তবে হা, আজ এই বয়সে এসে অন্তত ছোটখাটো ২/৪টি তেমনি অভ্যাস (দাসত্ব) থেকে মুক্তি পেয়েছি। এবং সে জন্য আমি যাদের দ্বারা inspired বা motivated হয়েছি তাদের নাম উল্লেখ না করলেই নয়। প্রথমেই আসে প্রফেট হজরত মোঃ (সঃ), তারপর মিঃ মিজান (মামা), ওইভা এরোনেন, ডঃ নরমান ডয়জ, ডঃ আরশ মাজহারী (ফ্যামিলি ডঃ), এবং নাম না জানা টরোন্টোর এক আফ্রো-কানাডিয়ান যুবক।

ওই আফ্রো-কানাডিয়ান যুবকের কথা আগেই বলেছি, যে কিনা আমাকে বাইরে গার্বেজ না ফেলা এবং গাড়িতে সব সময় একটি ছোট গার্বেজ ব্যাগ রাখার অভ্যাস করে দিয়েছিলো (আমাকে লজ্জিত করে )। আমার প্রফেশনে অনেক সময় সিগারেট, মদ, গাজা, হেরোইন ইত্যাদিতে আসক্ত লোকের সাথে কাজ করতে হয়, এবং অনেক সময় তাদেরকে এই সমস্ত আসক্তি থেকে মুক্তি বা harm-reductionএ কাউন্সেলিং/সাহায্য করতে হয়। ৫/৬ বছর আগে হটাৎ একদিন মনে হলো আমি ওদের এই দীর্ঘদিনের প্রিয় অভ্যাস থেকে বিরত থাকতে বলি, কিন্তু অনুভবটা কেমন তাতো জানি না, অর্থাৎ এই অভ্যাস পরিবর্তন কত কঠিন হতে পারে তা ভালো করে জানি না। যাহোক ঠিক ওই সময় আমার ফ্যামিলি ডাক্তারের সাথে এক আলোচনায় সিদ্ধান্ত নিলাম আমার ৪০ বছরের ভাত, রুটি এবং মিষ্টি (প্রক্রিয়াজাত) খাওয়া অভ্যাস কিভাবে ত্যাগ করা যায়। মনে পড়লো প্রফেট হজরত মোঃ (সঃ) এর কথা। উনি নাকি কোনো এক বাচ্চাকে বেশি মিষ্টি খেতে নিষেধ করার আগে নিজে মিষ্টি খাওয়া কমিয়ে নিয়েছিলেন।

যাহোক জিনিসটি অত্যান্ত কঠিন হলেও ৩/৪ মাসের মধ্যে সফল হই এবং ভালো করে বুঝতে পারি একটি দীর্ঘদিনের অভ্যাস বদলানো কত কঠিন। পরীক্ষামূলক হলেও এখনো চলছে সেই ভাত এবং মিষ্টিবিহীন জীবন। এতে জীবনে অনেক সুবিধা এসেছে। এখন মাসে একদিন ভাত মিষ্টি খেয়ে দেখলেও আর প্রতিনিয়ত খেতে ইচ্ছা হয় না। যাহোক এই সফলতার সূত্র ধরে ছোট ছোট আরো কিছু অভ্যাস পরিবর্তন সম্ভব হলেও এখনো অনেক বাকি। আমি জাস্ট আর ২/১টি এমনি পরিবর্তিত অভ্যাসের কথা বলে শেষ করবো।

গাড়িতে, বাড়িতে বা বাইরে কোথাও পানির বোতল ব্যবহার ছিল আমার একটি সিরিয়াস অভ্যাস। গাড়িতে একটি reusable পানির বোতল থাকলেও নো-ফ্রিলস এর $১.৮৭ এ ২৪টি পানির বোতলের লোভ সামলাতে পারতাম না। এবং স্বীকার করতে লজ্জা লাগে যে পানির বোতলগুলি সবসমই ঠিক মতো recycleও করতে পারতাম না। ফলে ছোটোখাটো একটি অপরাধবোধ কাজ করতোই। আর বিশেষ করে টরোন্টোর হারবার ফ্রন্টে গেলে লেকের পাড় ঘেঁষে যখন অসংখ শূন্য পানির বোতল দেখতাম , তখন আরো অপরাধী মনে হতো। যাহোক এর পর গত বছর একটি খবরে দেখলাম একটি তিমি মাছের পেট থেকে ৩০/৪০ কেজি প্লাষ্টিক সামগ্রী এবং প্লাষ্টিক বোতল বের হয়েছে, এবং মাছটি না খেয়ে মারা গেছে। ওগুলিকে সে খাবার হিসাবে খেয়েছে এবং তাতে তার নিউট্রিশনের কাজ হয়নি। well, এটি ছিল wake up call . কোনো promise করিনি। ভাবলাম অভ্যাসটি পরিবর্তনের পরে সিলেব্রেট করবো।

আনন্দের বিষয় গতবছরের শেষের দিক থেকে সেটি সম্ভব হয়েছে। ছবিতে দেখছেন একটি ৪ লিটারের কন্টেনার এবং একটি BPA ফ্রি ছোট reusable বোতল। প্রতিদিন ওই কন্টেনারে পানি নিয়ে গাড়িতে রাখি এবং ছোট বোতলে ঢেলে ঢেলে পান করা হয়। এতে করে প্লাষ্টিক বোতল ব্যবহার করা দরকার হয় না এবং দিনে কি পরিমান পানি পান করছি সেটির হিসাব থাকে। Thank God for this . এর পর মনে হলো যখন বাইরে যাই তখনও এই প্লাস্টিক বোতলের বিড়ম্বনা। আপনি দেখবেন অনেক লোকসহ যদি বাইরে পিকনিকে যান অথবা বাসায় দাওয়াত দেন কখনই কেউ তাদের বোতলের পানি শেষ করেন না এবং বোতলগুলি যত্র তত্র ফেলে রাখেন। অসংখ বোতলের ব্যবহারের সাথে সাথে সুপেয় পানিরও অপচয়। তাই রোজার আগে বাসায় কিছু লোক দাওয়াত দিলে, তাদেরকে reusable গ্লাস দেই, এবং সবাই সুন্দরভাবে সেগুলি ব্যাবহার করেন।
ঠিক তেমনি এবার কম্পিংয়ে গিয়ে প্লাস্টিক প্লেট এবং বোতল absolutely ব্যান করা হয়, এবং আনন্দের বিষয় ১৫/১৬ জন সদস্যের সবাই সেটি রপ্ত করে ফেলেন। এবং অধিকাংশ সদসই নিজের থেকে বলেছেন আগামী থেকে তারা বাসা থেকে reusable প্লেট, গ্লাস এবং কাটা চামচ বা চামচ নিয়ে আসবেন। এইতো, এতে কমকি। আপনার পুরা পৃথিবীর লোকের অভ্যাস বদলানোর দরকার নেই, জাস্ট নিজেরটা করুন, আর পারলে আসে পাশের ২/১ জনকে উৎসাহিত করে, এতেই আপনার পার্ট টি করা হবে।

তবে এই ধরণের অভ্যাসের দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে কোনো একজন buddy হলে ভালো হয়। তাহলে সে আপনাকে সচেতন করবে আর আপনি তাকে করবেন, এতে কাজটি সহজ হয়। আর একটি কথা, এমনি কোনো অভ্যাস পরিবর্তন বা ভালো একটি নতুন অভ্যাস তৈরী করতে গেলে, তার ফলাফল রাতারাতি আশা করলে চলবে না। আপনাকে কিছুদিন সময় দিন। এবং একেবারে সব একসাথে করেত গিয়ে নিজেকে overwhelmed করে ফেলবেন না, তাহলে খুব দ্রুতই demotivated হয়ে যাবেন।

দেশ আইন করে একটি জিনিস পরিবর্তন করতে বাঁধ করবে, তার আগে দেখুন নিজে নিজে সেটি করতে পারেন কি না। তাহলে দেখবেন নিজের কাছে খুব ভালো লাগবে, এবং এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র accomplishmentগুলি আপনাকে অনেক বড়ো কিছুতে স্টেপ নেওয়ায় সহায়তা করবে। এবং মুক্তি পাবেন আপনি আপনার এই জাতীয় অভ্যাসের দাসত্ব থেকে।

সবাই ভালো থাকেবন। বাসায় দাওয়াত দিলে সবাইকে তো আর প্লেট আর গ্লাস সঙ্গে আন্তে বলা যাবে না, তাই অন্তত প্লাস্টিক বা স্টাইরোফোম ব্যবহার না করে recylcebale গ্লাস-প্লেট বেবহার করুন, আর প্লাস্টিক পানির বোতল বর্জ্জন করুন। নিজের গার্বেজ নিজে পরিষ্কার করুন, এবং গার্বেজকে যথাযত জায়গায় ফেলুন।
বাংলাদেশের পরে আমার জীবনের বেশি সময় কেটেছে স্কান্ডেনেভিয়া এবং কানাডাতে। আমার কাছে এই দেশগুলির সব থেকে নাম্বার ওয়ান পছন্দের জিনিস হলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, তাই আমি যখন এগুলি ভোগ করছি তখন আমারও দায়ীত্ব আমার অংশটুকু করা।
অবশেষে আপনাদের কাছে দোআ চাচ্ছি আমার বর্তমানে একটি ক্ষুদ্র কিন্তু significant একটি অভ্যাস পরিবর্তনে। কাজ চালিয়ে যাচ্ছি, এখনো ১০০% সফল হয়নি। সেটি হলো বাজারে গেলে প্লাষ্টিক বেগ ব্যবহার না করা। গাড়িতে reusable ব্যাগ থাকে, তারপরেও মাঝে মাঝে ভুল হয়ে যায়। দেখা যাক কতদিন লাগে। সরকারে এই ব্যাগ বন্ধ করার আগে অভ্যাসটি পরিবর্তন করতে পারলে ভালো লাগবে।

ধন্যবাদ।
মুকুল, টরন্টো

3,744 total views, 5 views today

প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। পোষ্ট লেখক অথবা মন্তব্যকারীর অনুমতি না নিয়ে পোস্টের অথবা মন্তব্যের আংশিক বা পুরোটা কোন মিডিয়ায় পুনঃপ্রকাশ করা যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *