আমার বাবা

আমি কাজ করছি একটা মন্তেসরি স্কুলে  (দেড় থেকে ৩ বছরের বাচ্চাদের সাথে ) লিড টিচার হিসাবে। তাই প্রতি সপ্তাহে এই সব ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের জন্য আমার করতে হয় প্রতিদিনের লেসন প্লান। সেখানে রাখতে হয় Science and nature, dramatic play, Art and Crafts , Music and Movement, Cognitive, Language and Literacy, Quiet Activities. আজকের বাবা দিবসকে সামনে রেখে প্লান করেছিলাম বাচ্চাদের দিয়ে এমন একটা কার্ড বানাবো যা দেখি প্রতিটি বাবা যেন নিজেকে তার সন্তানের কাছে তিনি যে বিশেষ কেউ তা বুঝতে পারেন। তাই বাচ্চাদের সাহায্য করেছিলাম কাগজ দিয়ে শার্ট আর টাই বানাতে। আর কাজগুলো করতে গিয়ে মনে পড়ছিল আমার বাবার কথা। আমার বাবা ছিলেন আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। যিনি আমার জন্য তৈরি করেছিলেন একটি মসৃণ পথ। যে পথ ধরে হেটে এসেছি জীবনের এতটা সময় । আমার বাবার ভুবন ছিল আমাদের ঘিরে। তিনি যখন দুপুর বেলা ক্লান্ত শরীরে অফিস থেকে বাসায় ফিরে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে যেতেন আমরা ভাইবোনেরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম তার ঘুম ভাঙ্গার। মা বিকেলে চা নাস্তা নিয়ে  যখন খাটের পাশের চেয়ারে এসে বসতেন আমরা সব ভাইবোন ততক্ষন খাটের উপর আব্বার চারপাশে বসে গল্প শুনছি তার অফিসের বা বাইরের কোন মজার ঘটনা। আব্বা বলতেন তার ছোটবেলার মজার সব অভিজ্ঞতার গল্প । তার অনেক কস্টের গল্প। যিনি মাত্র ছয়মাস বয়সে মাকে হারিয়েছিলেন। আর তার বাবাকে হারিয়েছিলেন যখন তিনি ক্লাশ সিক্সে পড়েন। তাই তো তিনি আমাদের মধ্যে ফিরে পেতে চাইতেন তার হারিয়ে যাওয়া মা বাবাকে। আমার বাবার একটা মোটর সাইকেল ছিল। আমি ছোট বেলা বাদুর ঝোলা হয়ে তাতে চড়ে সব জায়গায় যেতাম । বাজার থেকে শুরু করে তার পড়ানোর জায়গা ফরিদপুর প্যারামেডিক্যাল স্কুল যেটা এখন ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ, ডিস্ট্রিক কাউন্সিল অফিস, স্টেডিয়াম । অথবা কোন এক সন্ধায় আব্বা মার সঙ্গে ছায়াবাণি সিনেমা হল। তিনি আমাদের প্রয়োজনে ১৪ বছর কাটিয়েছেন দেশের বাইরে। সেই সময়ে প্রতিটি সপ্তাহে আমরা সাত ভাইবোন অপেক্ষা করতাম তার চিঠির। পাঠাতেন ঈদের শুভেচ্ছা কার্ড। যখন দেশে ফিরে আসলেন তখন আমরা সব ভাইবোনরা ব্যস্ত যার যার কর্মজীবন আর সংসার নিয়ে। ঈদ বা ছুটিতে তিনি আশায় থাকতেন ছেলেমেয়ে নাতিনাত্নি সবাইকে নিয়ে  সময় কাটানোর। কিন্তু কতটুকু সময় তাকে দিতে পেরেছি? তিনি আমাদের সবাইকে ফেলে চলে গেছেন ওপারে। আমার প্রতিটি প্রার্থনায় থাকেন তিনি। আমি এখন শুনতে পাই তার আদর মাখা কণ্ঠ “ কেমন আছো মা? কোন সমস্যা নাই তো?” 
যখন বাচ্চাদের সাথে কাজ করছিলাম তখন একটা কথাই বারে বারে মনের মধ্যে জমাট মেঘের মত ভারী হয়ে উঠছিল। কখনো আমার আব্বাকে বলা হয়নি — অনেক অনেক ভালবাসি আপনাকে।

7,272 total views, 2 views today

প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। পোষ্ট লেখক অথবা মন্তব্যকারীর অনুমতি না নিয়ে পোস্টের অথবা মন্তব্যের আংশিক বা পুরোটা কোন মিডিয়ায় পুনঃপ্রকাশ করা যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *