কাদম্বরীর দেবীর আত্মহত্তার কথা  …

বাংলা সংস্কৃতির ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক ঠাকুর বাড়িতে আত্মহত্তা | আত্মহত্তা করেছেন ঠাকুর বাড়ির বউ, আত্মহত্তা করেছেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকরের পুত্র জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী- কাদম্বরীর দেবী | রাতের আঁধারে সকলের অগোচরে নিজের ঘরে তিনি আত্মহত্তা করেছেন | খোলা জানালা দিয়ে বাড়ির কাজের লোকেদের কৌতুহলী চাহুনী ও কানাকানী গিয়ে পৌঁছালো সয়ং দেবেন্দ্রনাথ এর কানে | টানা দুদিন মৃত্যুর সাথে লড়ে, অবশেষে কাদম্বরী তার স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও তার সব চেয়ে প্রিয় মানুষ, আদরের রবীন্দ্রনাথ এর চোখের সামনে শেষ নিঃশাস ত্যাগ করলেন |

শশানে জলছে কাদম্বরীর চিতা | শশানে কাদম্বরীর চিতার সামনে দাড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ সৃতির পথ ধরে চলে যান শৈশবে | ঠিক এই ভাবে একদিন তার মা সারদা দেবী যখন চলে যান বাল্যকালে | ঠিক সেই সময় তার থেকে একটু বড় নববধু বালিকা তাকে পরম স্নেহে জড়িয়ে নিয়ে, মায়ের দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছিলেন | ধীরে ধীরে সময়কালে সকলে তাকে ভুলেও গেল | কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ? কি করে ভুলবেন তার নতুন বৌঠান কে ? পাল্কী চেপে সেই বালিকার নববধু সাজে তার ঠাকুর বাড়িতে আগমন | বালক রবির মরমে, সপ্নের দেশের রাজকন্যা, আগমনীর মতই ছিল সেই বালিকাই তার “নতুন বৌঠান”| তার জ্যোতি দাদার স্ত্রী “কাদম্বরী দেবী” |

লেখক ও শিল্পী রবীন্দ্রনাথের নাম ডাক চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে | রবীন্দ্রনাথ সব সময় ব্যস্ত তার রচনা নিয়ে | ব্যস্ত তার প্রিয় সঙ্গী ও সমালোচক তার নতুন বৌঠানকে নিয়ে তার সৃষ্টি কাজ দিয়ে খুশি, কাজ দিয়ে ব্যস্ত করতে | তার এই মনের মানুষটির স্বীকৃতি তার এক মাত্র লক্ষ্য | আসলে কাদম্বরী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রতি কাজের প্রথম সাক্ষী ও শ্রোতা | তিনি সহজে খুশি হোতেন না | কারণ কাদম্বরী চাইতেন তার ভানু অর্থাৎ আদরের রবির কেও কোনো খুঁত খুঁজে না পায় আর এ ভাবেই রবীন্দ্রনাথ পরতে পরতে সম্পূর্ণ হয়ে উঠছিলেন নিজেরই অজান্তে | আর তাই সেই সময় তার প্রতিটি সৃষ্টি কাজ এ মিলে মিশে যাচ্ছেন তার বন্ধু, তার আদরের নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবী বার বার |

কাদম্বরী দেবীকে এক সময় চরম একাকীত্বের জীবন যাপন করতে হয় | কারণ সংস্কৃতির ও ব্যবসায়ের বাস্ততায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে এক সময় অনেক টাই দুরে নিয়ে চলে যায় তার স্ত্রী কাদম্বরী দেবীকে | সেই সময়ের বিখ্যাত নাট্যকার জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এর ব্যস্ততার আরও কারণ ছিলেন স্টার থিয়েটারের বিখ্যাত অভিনেত্রী “নটি বিনোদিনী” এবং তার বড় দাদা সতেন্দ্রনাথ এর স্ত্রী অর্থাৎ তারি বৌদি জ্ঞ্যনদানন্দিনী দেবী | ঠাকুর বাড়ির মর্যাদা রক্ষায় স্বামীর এই দুই অসুমো সম্পর্ক নীরবে মেনে নিতে বাধ্য হলেন কাদম্বরী | একা ও নিঃসন্তান কাদম্বরী তারি ননদ স্বর্ণ কুমারীর চোট মেয়ে উর্মিলাকে মেয়ের স্নেহ ঢেলে দিয়ে আকড়ে নিলেন | ভাগ্যের উপহাসে কয়েক মাস পরে সিঁড়ি থেকে পরে মারা যায় ছোট্ট উর্মিলা | গোটা ঠাকুর বাড়ি দায় করে কাদম্বরীকে | প্রতিকুল সেই সময় কাদম্বরী বেশি করে জড়িয়ে নিলেন তার প্রিয় ভানুকে অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ কে | উভই একে অপরের ছায়ার সঙ্গী |

ওই সময় রবীন্দ্রনাথ এর ব্যক্তি জীবনে সব চেয়ে সোনালী সময় | কিন্তু কাদম্বরীর ও রবীন্দ্রনাথ এর সক্ষমতাকে অন্য কারোর ঈর্ষার কারণ হয়ে যায়নি তো ? পদমর্যাদায় ঠাকুর বাড়ির বড় বউ জ্ঞ্যনদানন্দিনী তার গরিমায় সয়ং দেবেন্দ্রনাথ ও তার এই পুত্র বধুটিকে সমঝে চলেন | চিরকালই নারী নারীর শত্রু | ঠাকুর বাড়ির ঐতিহ্যেতার ব্যতিক্রম ঘটল না, আর তাই কাদম্বরীর অদৃষ্টে তার ভানু সঙ্গ সুখ বেশি দিন সইলো না | সময় এখানেও খেলা করে যায় কাদম্বরীর সাথে | কাদম্বরীর নিজের হাতে জালা আগুনের আচ পেতে চাইছে এখন অনেকে |

রবীন্দ্রনাথ ক্রমে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন বাইরের সংস্কৃতির পরিমন্ডলের সাথে | রবির কিরণ কে আর উষ্ণ বদ্ধ করে রাখা সম্ভব হচ্ছেনা | কাদম্বরীর একাকীত্বের যন্ত্রনায় কাদম্বরী দগ্ধ হচ্ছে প্রতিনিয়ত | আর সেই আগুনে বাকি ঘ্রিতাহতের কাজটি করলেন জ্ঞ্যনদানন্দিনী | রবীন্দ্রনাথ এর বিয়ের ব্যবস্থা করলেন | দেবেন্দ্রনাথ কে রাজী করিয়ে জ্ঞ্যনদানন্দিনী খুব সাদামাঠা ভাবে তরীঘড়ি করে রবির বিয়ে দিলেন | অজ পাড়া গাঁয়ের মেয়ে ভবতারিণীর সাথে | পরে ঠাকুর বাড়ি থেকে তার নতুন নাম দেওয়া হয় “মৃনালিনী” | বংশের অনুশাসনের মর্যাদায় রবীন্দ্রনাথ নীরব থাকলেন | নির্বাক কাদম্বরীর তার ভানু কে তার ফিরে পাবার আর্তে বন্ধ ঘরের দেয়ালে মিলিয়ে গেল বারংবার | কাদম্বরীর চোখের জলে অতীত মুছে গেল অচিরে | বিজয়ীর হাসি হাসলেন, জ্ঞ্যনদানন্দিনী | কাদম্বরীর একাকীত্বের যন্ত্রণার সাথে যোগ হয়েছিল অপমানের জালা | স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রর জামার পকেট থেকে অন্য রমনীর লেখা প্রেম পত্র আবিষ্কার করলেন কাদম্বরী | আত্মহত্যার চেষ্টা করেও সফল হলেন না | তার ভানুকে আকড়ে ধরে বেঁচে রইলেন | কিন্তু এবারে সফল হতেই হবে | চরম একাকীত্বের অবসাদে তারি মানসিক প্রস্তুতি নিছিলেন অনেক দিন ধরে | অনিবার্য ভাবে এগিয়ে এলো সেই রাত |

জ্যোতিরিন্দ্রএর নতুন জাহাজের উদ্ভোধনী অনুষ্ঠানে গিয়েছে সকলে | গিয়েছে জ্ঞ্যনদানন্দিনী, গিয়েছে সস্ত্রীক রবীন্দ্রনাথ, এবং অনান্যরাও | বাড়িতে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এর জন্য নীলাম্বরী সাজে সেজে অপেক্ষারত কাদম্বরী | স্বামী আসবেন তাকে নিয়ে যেতে | এই আশায় প্রহর এগিয়ে চলে, কিন্তু আসে না কেও | সকলেই ভুলেছে তাকে আজ, ভুলেছে তার প্রিয় ভানু ও | তাহলে কার জন্য এই সাজ আজ আমার ? কার জন্য অপেক্ষা ? কার জন্য বেঁচে থাকা | আজ তার যে বড় অভিমান |

ঘুম ছিল না তার চোখে দিনের পর দিন | সামান্য ঘুমের প্রয়োজনে অনেক দিন আগেই বাড়ির ধোপানী বিশুর কাছ থেকেই নিয়ে রেখেছিলেন ঘুমের বড়ি | কিন্তু আজ বড় অভিমানে তার একটা বড় ঘুম দরকার | দরকার চির নিদ্রার | অপেক্ষার মধ্যরাতে সবকটি ঘুমের বড়ি খেয়ে নিলেন একে একে | চির ঘুমের দেশে পৌঁছে গেলেন কাদম্বরী | হয়তো চেয়েছিলেন, সেখানে অপেক্ষা করবেন তার প্রিয় মানুষটির জন্য ||

***নীলিকা নিলাচল ***

 

 

 

১ মন্তব্য

  1. কবি গুরুর পরিবারের এ ঘটনার সাথে আরো কিছু বিষয় আছে। যা অনেকে উল্লেখ করেননা। তবে আপনি যতটুকু উল্লেখ করেছেন তাতে অনেক কিছুই প্রকাশ পেয়েছে। তথ্য সমৃদ্ধ লেখাটির জন্য ধন্যবাদ।

আপনার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন